'অপ্রমাদ' শব্দের অর্থ হচ্ছে উদ্যম, উৎসাহ, উত্থানশীলতা, পরাক্রম, জাগ্রতভাব, স্মৃতিমান, সংযমশীলতা ইত্যাদি। অপ্রমাদ বুদ্ধের সমস্ত শিক্ষার ভিত্তি ও মূলনীতি। নির্বাণ লাভের জন্য অপ্রমাদ অত্যাবশ্যক। 'ধর্মচক্র প্রবর্তন' সূত্রে অপ্রমাদকে জ্ঞান মার্গ লাভের সোপান বলে অভিহিত করা হয়েছে। মহাপরিনির্বাণ সূত্রে বর্ণিত বুদ্ধের অন্তিম উপদেশসমূহের সারকথাই হচ্ছে অপ্রমাদ। বুদ্ধ বলেছেন, 'যত প্রকার সবল প্রাণীর পদচিহ্ন আছে তার মধ্যে হাতির পদচিহ্ন সর্বাপেক্ষা বৃহৎ। এরূপ কুশল কর্মের মধ্যে অপ্রমাদই সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।' অপ্রমাদ ব্যতীত স্মৃতির অনুশীলন সম্ভব নয়। অপ্রমাদ স্মৃতিকে জাগ্রত করে। যাঁরা স্মৃতিকে জাগ্রত রাখেন তাঁরা নির্বাণ লাভ করেন।
অপ্রমাদ বর্গে অপ্রমত্ত এবং প্রমত্ত ব্যক্তির স্বরূপ সম্পর্কে বর্ণনা পাওয়া যায়। যিনি অবিচল থেকে নিষ্ঠার সঙ্গে সৎকাজ করেন তিনি অপ্রমত্ত ব্যক্তি। অপ্রমত্ত ব্যক্তি রাগ-দ্বেষ-মোহ দ্বারা বশীভূত হন না। তিনি সর্বদা জাগ্রত থাকেন। ধর্মাচরণে তৎপর থাকেন। কর্তব্যকর্মে অবিচল থাকেন এবং সর্বদা কুশলকর্ম সম্পাদন করেন। তিনি সংযত, শান্ত, অচঞ্চল, ধীর এবং প্রজ্ঞাবান হন। তিনি জন্ম-মৃত্যুর শৃঙ্খল ছিন্ন করে নির্বাণ লাভ করতে সক্ষম হন। এজন্য তিনি মৃত্যুঞ্জয়ী। অপরদিকে, প্রমত্ত ব্যক্তি অসংযত, অস্থির এবং আলস্যপরায়ণ হন। সে রাগ-দ্বেষ-মোহ দ্বারা বশীভূত হয়। সে হিংসা ও আক্রোশের বশে অন্যের ক্ষতি করে। প্রমাদ তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়।
তার পক্ষে জন্ম-মৃত্যুর শৃঙ্খল ছিন্ন করা সম্ভব নয়। সে নির্বাণ লাভ করতে পারেন না। প্রমত্ত ব্যক্তির অবর্ণ, অকীর্তি, দুর্নাম দৈনন্দিন বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়। এজন্য প্রমত্ত ব্যক্তি জীবিত থেকেও মৃতবৎ। বুদ্ধগণ প্রমাদকে সর্বদা নিন্দা করেন। অপ্রমাদকে সর্বদা প্রশংসা করেন।
অপ্রমাদ বর্গের সঙ্গে একটি উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক ঘটনা জড়িত আছে। কথিত আছে, নিগ্রোধ শ্রমণের মুখে অপ্রমাদ বর্গের গাথা শুনে সম্রাট অশোক বৌদ্ধধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন এবং বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর পরামর্শে সম্রাট অশোক প্রতিদিন ষাট হাজার ভিক্ষুর নিত্য আহার ও পথ্যের ব্যবস্থা করেছিলেন। বৌদ্ধধর্মের প্রচার প্রসারে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তিনি বিভিন্ন দেশে বৌদ্ধধর্ম প্রচারের জন্য ধর্মদূত প্রেরণ করেছিলেন। তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় অসংখ্য বৌদ্ধ বিহার, স্তূপ, স্তম্ভনির্মিত হয়েছিল। তিনি অনুশাসন আকারে বুদ্ধবাণী পর্বতগাত্রে এবং স্তম্ভে লিখে রাখতেন। সম্রাট অশোকের অনুশাসনের মূলকথাও ছিল অপ্রমাদ। এতে বোঝা যায়, অপ্রমাদ বর্গের গুরুত্ব অপরিসীম। অতএব সকলের অপ্রমাদপরায়ণ হওয়া উচিত।
অনুশীলনমূলক কাজ |
Read more